হোয়াইট হাউজে প্রত্যাবর্তনের পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন নতুন সিদ্ধান্ত মার্কিন নাগরিকদের বড় অংশকে ক্ষুব্ধ করেছে। ফলে ওয়াশিংটনে বেড়েছে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ। এর বিপরীতে আমদানিতে উচ্চ শুল্কের মতো মার্কিন প্রেসিডেন্টের কিছু পদক্ষেপের কারণে ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দেশটির করপোরেট খাতে অস্বাভাবিক নীরবতা দেখা যাচ্ছে। অথচ একসময় রাজনৈতিক ও সামাজিক নানা ইস্যুতে কোম্পানিগুলোর নিজস্ব বক্তব্য থাকত, তহবিল জোগানও দিত তারা।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে শুধু বাণিজ্যনীতিতেই পরিবর্তন আসেনি। অভিবাসন, কর্মক্ষেত্রে বৈচিত্র্যের লালনসহ বিভিন্ন ধরনের অনুশীলনে রক্ষণশীল প্রবণতা বেড়েছে। যা দেশটির ব্যবসায়িক পরিবেশকেও প্রভাবিত করছে।
দ্য গার্ডিয়ানের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুসারে, বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী কিছু কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্রের অনিশ্চিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সাবধানে পা ফেলার নীতি অনুসরণ করছে। কারণ ট্রাম্প প্রশাসনের মতিগতি খুবই অস্থির ও হোয়াইট হাউজ এখন বিপরীত কোনো প্রতিক্রিয়াকে সহজভাবে নিচ্ছে না।
চিকিৎসা প্রযু্ক্তিবিষয়ক কোম্পানি মেডট্রনিকের সাবেক চেয়ারম্যান ও সিইও বিল জর্জের মতে, কোম্পানি নির্বাহীরা দুটি বিষয় পছন্দ করেন—স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যতের পূর্বাভাস। ব্যবসায়িক পরিকল্পনার জন্য পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে তারা জানতে চান। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের ক্ষেত্রে কেউই বুঝে উঠতে পারছে না কী হচ্ছে, কারণ সেখানে সবকিছুই ট্রাম্প প্রশাসনের স্বার্থকেন্দ্রিক।
মার্কিন শীর্ষ নির্বাহীদের প্রতি বিল জর্জের পরামর্শ, ‘চুপচাপ কাজ করে যাও। প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ঝামেলায় জড়িও না।’
নির্বাচন প্রচার থেকে করপোরেটদের কাছ থেকে বড় ধরনের সুবিধা পেয়ে আসছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার মার-আ-লাগো রিসোর্টে আয়োজিত পার্টি বা অভিষেক অনুষ্ঠানে শীর্ষ করপোরেটদের উপস্থিতি ছিল চোখের পড়ার মতো। সম্প্রতি নবজাতকদের জন্য চালু হওয়া ‘ট্রাম্প অ্যাকাউন্টসের’ প্রচারে যোগ দেন গোল্ডম্যান স্যাকসের ডেভিড সলোমন থেকে শুরু করে উবারের দারা খোসরোশাহি পর্যন্ত অনেক শিল্পনেতা।
ট্রাম্পের অভিষেক তহবিলে কোটি কোটি ডলারের অনুদান দিয়েছিলেন করপোরেট ও নির্বাহীরা। মেলানিয়া ট্রাম্পকে নিয়ে একটি তথ্যচিত্রের জন্য ৪ কোটি ডলার খরচ করেছে অ্যামাজন। যুক্তরাষ্ট্রে ৫০ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে অ্যাপল। কিন্তু ট্রাম্পের নীতিবিরুদ্ধ মন্তব্য আসতেই এসব প্রচেষ্টা কোনো কাজে লাগছে না। আমদানি শুল্কের প্রভাবে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি হবে এমন মন্তব্যের জেরে সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন অ্যামাজনকে ‘বিরূপ ও রাজনৈতিক’ বলে আখ্যা দেয়। অ্যাপলকেও ব্যাপক ট্যারিফের হুমকি দেন তিনি।
তবে নিজস্ব বক্তব্য জোরগলায় বলতে গিয়ে সবচেয়ে করুণ পরিণতির মুখোমুখি হয়েছেন টেসলার সিইও ইলোন মাস্ক। একসময় ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠ মনে হলেও সাম্প্রতিক পরিস্থিতি একদমই এ ধনকুবেরের অনুকূলে নয়। নির্বাচনী প্রচারে রিপাবলিকান তহবিলে ৩০ কোটি ডলারের বেশি অর্থ দেন মাস্ক। ট্রাম্প প্রশাসনে মাসখানেক কাজও করেন তিনি। কিন্তু ইলোন মাস্কের পদত্যাগের কয়েক দিনের মধ্যেই তার কোম্পানির ফেডারেল চুক্তি ও কর-ছাড় বাতিলের হুমকি দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ডার্টমাউথের টাক বিজনেস স্কুলের করপোরেট কমিউনিকেশন বিষয়ক অধ্যাপক পল আর্জেন্তির মতে, ইলোন মাস্কের পরিণতি থেকেই বোঝা যায় কেন নির্বাহীরা প্রেসিডেন্টের ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না। কারণ খামখেয়ালি ট্রাম্পকে তারা ‘এক অজানা বিপদ হিসেবে দেখছেন।
হিলারি ক্লিনটনের সাবেক ভাষণলেখক ও পরামর্শক সংস্থা এভারগ্রিনের সহপ্রতিষ্ঠাতা ড্যান শ্যুয়েরিন বলেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষেত্রে আনুগত্য হলো একমুখী। এটা যেন মাফিয়ার সঙ্গে ব্যবসা করা। যেখানে আপনি জিতবেন না, নিরাপদও থাকবেন না।’
তার মতে, করপোরেট মহলে পরিচিত কৌশল হলো ‘একটা বড় ঘোষণার ঢাকঢোল পেটাও। বিশদ দরকার নেই, বাস্তবায়নও জরুরি নয়—শুধু হোয়াইট হাউজকে সন্তুষ্ট করো’।
এ পরিস্থিতিতে ‘চরম সতর্কতা’ এখন করপোরেট কৌশল হয়ে উঠেছে—যে করেই হোক, এ প্রশাসনের নজরে না পড়াই বুদ্ধিমানের কাজ। কিন্তু শুধু মার্কিন প্রেসিডেন্টকে খুশি রাখলেই হবে না, শেয়ারহোল্ডার, গ্রাহক ও কর্মীদের কাছেও কোম্পানিগুলোর উত্তর দিতে হয়। এ উভয় সংকট নিয়েও সতর্ক করছেন বিল জর্জ।
পল আর্জেন্তির মতে, ইলোন মাস্কের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্পর্ক খারাপ হওয়ার পর করপোরেট দুনিয়া বুঝতে শুরু করেছে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা বা না রাখা দুটোই ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে কৌশলগত নীরবতা ও তোষামোদীর দিন হয়তো শেষ হয়ে আসছে। এখন কোম্পানিগুলো এক নতুন সিদ্ধান্তের দিকেই এগোবে, হয়তো বেশি সাহস দেখাবে বা নিজস্ব অবস্থান নেবে।
ড্যান শ্যুয়েরিন জানান, ‘ট্রাম্পের অসংলগ্ন ট্যারিফ নীতির বাস্তবায়ন অনেক নির্বাহীর চোখ খুলে দিয়েছে, এটা ব্যবসার জন্য খারাপ। তিনি বলেন, ‘আমার মতে, এখন একটু বেশি প্রতিরোধ দেখানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নতজানু হওয়ার চেয়ে মেরুদণ্ড থাকা ভালো।’
তবে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল ইস্যুতে সিইওরা বিশেষ কোনো অবস্থান নেবেন বলে মনে করেন না বিল জর্জ। কারণ এ ঝুঁকি নিয়ে তাদের লাভ নেই। তাই তিনি বলেন, ‘নিজের সেক্টরে থাকো। তুমি ব্যাংকার হলে অর্থনীতি নিয়ে কথা বলো, জ্বালানি তেলবিশেষজ্ঞ হলে জ্বালানি নিয়ে বলো।’
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রে মাত্র হাতেগোনা কয়েকজন ব্যবসায়ীই আছেন, যারা যেকোনো বিষয়ে সাহস করে মুখ খুলতে পারেন। যাদের অন্যতম জেপি মরগান চেজের প্রধান জেমি ডাইমন ও বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ের ওয়ারেন বাফেট। কারণ কোনো প্রেসিডেন্টই তাদের ক্ষেপাতে চাইবেন না।